🌱 একটি সামাজিক ও শিক্ষামূলক অরাজনৈতিক সংগঠন—স্বাগতম আমাদের পরিবারে 🌱 💐 সভাপতির শুভেচ্ছা বার্তা 💐

বুবুর বিয়ে

বুবুর বিয়ে
মোঃ আশিক মোস্তফা 



[১] 

বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। আগামী রবিবারে বিয়ের দিন ধার্য করা হয়েছে। গত আধঘন্টা আগেও পুরো বাড়ি ছিল পিনপতন নিরবতা। কিন্তু এখন বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বইছে। ফয়েজের তো আনন্দের সীমা নেই। সবার বুবুর মত তার বুবুরও বিয়ে হবে। লাল শাড়ি পড়ে বুবু যাবে শ্বশুর বাড়ি। এসবই এখন ভাবনায় ফয়েজের। শুধু খুশিই না, যেন স্বস্তির নিশ্বাসও বইছে। অন্তুর বাবার অবশ্য ছেলেকে নিয়ে একটু আপত্তি থাকলেও তার মায়ের  চাপে সেই আপত্তি আড়ালেই রয়ে গেল। বিয়ের খবরে সারা বাড়িতে সবার মনে স্বস্তি ও আনন্দের নিঃশ্বাস বইলেও অন্তুর হৃদয়ে জমে থাকা কষ্টের স্তুপে যেন প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছে আরো নতুন কষ্টের স্তুপ। যার ভারে নুইয়ে পড়ছে তার হৃদয়।

অশ্রুসিক্ত হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত হচ্ছে স্মৃতির পাতায় জমে থাকা স্পষ্ট দিনগুলি। তখন বয়স কত আর হবে! দশ কি এগারো। সকাল থেকে মায়ের প্রসব বেদনা উঠছে। বাড়িতে সবাই বেশ ব্যস্ত অন্তুর মাকে নিয়ে। ধরুনি দাদীকেও ডেকে আনা হয়েছে সেই ভোর বেলাতে। এতসব কিছুর পরেও অন্তুর চোখ ভরা আনন্দের ঝিলিক। কারণ তার দাদী তাকে বলেছে আজকে নাকি তার ভাই আসবে।

সূর্য হেলেছে, বেলাও গড়িয়েছে। কিন্তুর মায়ের ব্যথা  যেন আরো প্রবল হয়েছে। বাড়ি জুড়ে মায়ের চিৎকার। পরিবারের বাকি সব সদস্যদের কথাহীন চোখের উৎকন্ঠা। সূর্য ডোবার আগেই মায়ের ঘর থেকে ভেসে আসে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ। সকলের এক চিন্তার অবসান হলেও, ভেঙে যায় অন্তুর দুচোখ জুড়ে আকা সব স্বপ্ন। তার স্বপ্নের ভাই এসেছে পৃথিবীতে তবে ছেড়ে গিয়েছে তার নাড়ীর বাঁধনে বেঁধে থাকা মমতাময়ী মা। সেদিনের ঐ শোকে একফোঁটা চোখের পানিও ঝড়েনি অন্তুর। কেবলই অপলক দৃষ্টিতে চেয়েছিল সদ্য জন্ম নেওয়া তার ভাই আর সদ্য ভুবন ছেড়ে যাওয়া মায়ের দিকে। মা হারানো দিনে তার অশ্রু যেন থমকে গিয়েছিল।কিন্তু সেদিনের পর থেকে মা হারানোর বেদনার যে অবিরাম অশ্রু প্রতি রাতে ঝড়েছে তার সাক্ষী কেবল তার কোলে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট ফয়েজ আর নিস্তব্ধ সব রাতগুলো। চোখের পানিতে বালিশ গুলোও ভিজে গেলেও দিনে সূর্যের আলোতে  অশ্রুভেজা সেই দাগ মিলিয়ে যেত। তবে মনের দাগও মিলিয়ে যায়? হয় কি সব আগের মত? 

 অন্তুর, মা হারানোর দিন থেকে  হারিয়ে যায় তার সব শখ, আহ্লাদ।  সব চাওয়া পাওয়া হয়ে যায় কেবলই ভাইকে ঘিরে। ভাইকে দেখাশোনা করা, খাওয়া দাওয়া করানো, সঙ্গী  হয়ে খেলা করাই তার সারাদিনের কাজ হয়ে দাঁড়ায়। মা মরে যাওয়ার চার মাসের মাথায়ই নতুন বিয়ে করে অন্তর বাবা। নতুন মা অন্তুর জন্য আর মা হয়ে উঠেনি। সেসময় ফয়েজের দেখভাল করার জন্য স্থায়ীভাবে লেখাপড়ার ইতি টানতে হয় তাকে।

প্রবল আনন্দ চিৎকারে বুবু বুবু বলে দরজার ধাক্কায় স্মৃতির পাতা বন্ধ হয়ে যায় অন্তুর। চোখের নিচে বয়ে যাওয়া পানির ফোঁটা ওরনা দিয়ে মুছে দরজা খুলে দেই অন্তু। শুরু হয় দুই অন্তর আত্নার গল্প। চলছে ফয়েজের একদমে বকবকানি আর অন্তুর চুপ হয়ে একমনে উপযুক্ত শ্রোতা হয়ে সব গল্পের উপযুক্ত রায় দেওয়ার চিরচেনা চিত্র ।

 

[২]

আগামীকাল গায়ে হলুদ। সারাবাড়িতে আয়োজন চলছে। গত এক সপ্তাহ যাবৎ দিন গুনছে ফয়েজ। বুবুর কাছ থেকে ১থেকে ১০ পযন্ত গুনা শিখেছিল ফয়েজ।এর বেশী গুনতে পারে না ও। ফয়েজের সাথে তনয়াও আনন্দে মেতেছে। খুব সকালে মায়ের লুকোচুরি করে নিজের কাছে থাকা পুথির মালাটা বুবুকে বিয়ের উপহার হিসেবে দিতে এসেছিল তনয়া। বুবু তনয়ার দেওয়া মালা তনয়ার গলায় পড়িয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলেছে তার গলায়ই নাকি সুন্দর লাগছে। তনয়া অন্তর ছোট মায়ের একমাত্র মেয়ে। অন্তু আর ফয়েজকে অনেক ভালবাসে সে। তার মায়ের নিষেধ উপেক্ষা করে ফয়েজের সাথে দেখা করতে আসে তনয়া। অবশ্য   মায়ের চোখে পড়লেই পড়ার কথা বলে নিয়ে যায় তনয়াকে। এর জন্য অবশ্য কয়েকবার মারও খেতে হয়েছে তবে তা তনয়াকে নয়, ফয়েজকে।

ফয়েজকে নিয়ে অন্তুর চিন্তার কোনো শেষ নেই।সারাদিন তাকে দেখতেই তার দিন কেটে যেত। সে চলে গেলে সৎ মায়ের শাসন থেকে তাকে আগলাবে কে। গত পাঁচ দিন ধরে ফয়েজকে বুঝিয়েছে সে। কোনো প্রকার দুষ্টুমি যাতে না করে, ছোট মায়ের কথা যাতে ঠিক ঠিক শুনে, তনয়ার সাথে মারামারি না করে এরকম অসংখ্য কথা বলে বুঝাচ্ছে গত পাঁচ দিন যাবৎ।
সব কথার জবাবে বড় করে মাথা হেলিয়ে ফয়েজ বুবুকে জানিয়েছে সব কথা শুনবে সে।

 

[৩]

__ কিরে ফয়েজ একা বসে কেন? সীমান্ত মাঠে ঘোড়া দৌড় হবে আজ বিকালে। দেখতে যাবি না?
__ না রে তুই যা। আমার ভাল লাগছে না।
রবির প্রশ্নের জবাব আস্তে করে দিয়ে বাড়ির পিছনের বারান্দায় বসে পড়ল ফয়েজ।

মাস খানেক হলো অন্তুর বিয়ে হয়েছে। বুবুর বিয়ে নিয়ে আনন্দে মাতলেও বিয়ের দিন বুবু চলে যাওয়ার সময় শুরু হয় ফয়েজের কান্না। সেদিনের পর থেকে দূরন্ত ফয়েজ হয়ে যায় পুরোদস্তর নীরব। নাওয়া খাওয়া ঠিক মতো করে না। সে যে শুধু ওর বুবু ছিলনা, সে তো ওর সব। বুবু চলে যাওয়ার পরে মায়ের শাসনও যেন  তার কাছে কঠোর হয়ে গিয়েছে। বিয়ের তিন দিন পর অন্তু বাপের বাড়ি আসলে পিছু নেই ফয়েজ।ফয়েজের বায়নায় হেরে যেয়ে সাথে করে শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যায় অন্তু।  অন্তুর নিজের অন্তর বাঁধনে আবদ্ধ ভাইকে কাছে রাখার প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্বেও শ্বশুর বাড়ির মানুষের বিরোধিতার কারণে নিয়ে যাওয়ার চার দিনের মাথায় বাড়িতে দিয়ে যায় ফয়েজকে। রেখে আসার সময় ফয়েজ বুবু বুবু বলে পিছ থেকে অনেক জোরে চিৎকার করলেও আর পিছনে তাকায়নি তার বুবু।

ফয়েজ বারান্দার  একদম পিছনের খুঁটিতে হেলান দিয়ে একমনে ভাবছিল এসব কথা।
তবে গতকাল যে বুবু এসেছিল।অনেক আশায় ছিল এবার হয়ত বুবু তাকে নিয়ে যাব। ফয়েজের জন্য অন্তু ম্যাজিক বল নিয়ে এসেছিল।ম্যাজিক বল অনেক প্রিয় তার। কিন্তু আজ যে তার আর ম্যাজিক বল ভাল লাগে না। যাওয়ার সময় বুবুকে অনেক বললেও বুবু নিয়ে যায় নি।চলে যাওয়ার সময় শুধু ওরনা নিয়ে বার বার মুখে মুছেছে বুবু। প্রবল কান্নায় পিছন থেকে বুবু বুবু বলে ডাকলেও আর পিছনে ফিরেনি অন্তু। চাইলেও যে সাথে নিতে পারবেনা ঐ অন্তরের বাঁধনকে। জীবন সব কষ্ট পিছে রেখে যার জন্য এতো পরিশ্রম তার চোখ বেয়ে পানির পড়ার দৃশ্য দেখবে কেমনে অন্তু।

 

[৪]

ভোর ছয়টায় বাপের বাড়ি এসে পৌঁছেছে অন্তু।কিন্তু ততোক্ষণে বুবুর জন্য যে অপেক্ষায় নেই ফয়েজ।পাড়ি দিয়েছে তার মায়ের ঠিকানায়।অন্তু  ছোট্ট ভাইয়ের মাথার কাছে বসে বার বার হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সারামুখ।মুখে তার কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না।মা হারা সেই দিনের মতই দুইচোখ আজও হয়ে গেছে মরুভূমি।

বাড়িটা আজ তেমনই শুনশান নীরব,যেমন নীরব ছিল অন্তুর দেখতে আসার দিন।তবে আজকে কি সেই নীরবতা ভেঙে কেউ কি ভাসবে আনন্দের জেয়ারে। 
মেঝের পাশেই গড়াগড়ি খাচ্ছে গত সপ্তাহে ফয়েজকে দেওয়া ম্যাজিক বলগুলো।প্রতিটা ম্যাজিক বল যেন পাথর হয়ে পড়ছে অন্তুর  হৃদয়ের অন্ধ কূপে।অধীর প্রতিক্ষায় আজ মন তার সেই কথাটি শোনার জন্য।
 "বুবু বুবু আমার ম্যাজিক  বল লাগবে না। আমি তোর সাথে যাব। নিয়ে যাবি আমায়!! "

___ অসমাপ্ত __

Share:

Executive Team

Md Mohiuddin

Md Mohiuddin

President

Contact

Mehedi Hasan

Mehedi Hasan

Vice President

Contact

Al Mamun

Al Mamun

General Secretary

Contact

Al Mamun

Asif Mahmud

Organaizational Secretary

Contact

CLOCK

শুরুর দিকে

কাশ বন