আমি বরাবরই একজন রসকষহীন মানুষ। কোন দিবসে আমার খুব একটা অনুভূতি অনুভব হয়না। তো সে বার দাদা বাসায় ছিলাম। সেদিন ছিলো সরকারি ছুটি ২১ শে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে। আমি সকালে ঘুমে কাতর। হয়তো পাঁচটা কিংবা সাড়ে চারটা হবে দাদা দরজার কড়া নাড়ছেন। এতো সকালে কেউ ডাকে না তাই কেউ অসুস্থ হললো কিনা ভেবে তাড়াতাড়ি দরজা খুললাম। দেখলাম দাদা পাঞ্জাবি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। দাদা বললো,"এই চল আজ শহিদ মিনারে যেতে হবে"
"দাদা আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি যাও। আমাকে ঘুমাতে দাও"
"না তোকে যেতেই হবে। চল"
দাদা আমার হাত ধরে টানতে টানটে নিয়ে গেলো। আমি আমার ঘুম জড়ানো চোখেই গোসল করে সাদা একটা পাঞ্জাবি পড়লাম।
দাদার পিছনে আমি হাটছি। কিন্তু রাস্তাটা ভিন্ন লাগলো।
"দাদা শহিদ মিনার তো ওই দিকে ছিলো।"
"হ্যাঁ চল এদিকে ছোট একটা মিনার আছে। ওটাতে অনেক ভীড় থাকবে। "
"কিন্তু ফুল কই?"
"চল সব আছে। "
তারপর দাদা একটা ছোট মসজিদে নিয়ে গেলো। বললো শহিদের উদ্দেশ্যে নফল নামাজ পড়তে।
আমি নামাজ পড়ে বাইরে এসে দাদার জন্য অপেক্ষা করছি। একটু পর দাদা এসে বলো, "চল"
আমি বাধ্য ছেলের মতো হাটতে শুরু করলাম।
দাদা স্টেশনের সামনে এসে দাঁড়ালেন। অনেকে এই ঠান্ডায় শুয়ে আছে এই ঠান্ডায়। কারো গায়ে হালকা একটা চাদর। এই শীতে কিভাবে এরা রাত কাটায় আমি সেটা ভাবতেই পারিনা। যদিও এখন শীতটা অনেকটা কমে এসেছে। দাদা আমাকে কিছু টাকা দিলেন বললেন একপাশ থেকে দিতে। আমি টাকা গুলো একপাশে থেকে সবাইকে দিতে থাকলাম। সবার ভাগে খুব বেশি টাকা পড়েনি। তবুও সকলে খুশি।
আবার দাদার পিছনে হাটছি। আমি কৌতুহলী মনে জিজ্ঞেস করলাম, "দাদা আমাকে শহিদ মিনারে নিয়ে যাবে বলে এগুলা কি করালে?"
দাদা হাসলো। তারপর বললো,"হায়রে বোকা। আচ্ছা শুন শহিদ মিনারে আমরা কি করতাম? কিছু ফুল কিনে দিয়ে দিতাম? আর নাম দিতাম শহিদের স্মরন তাইনা? তার চেয়ে আমরা সেই টাকা সেই অসহায়কে দিয়ে দিলাম ভালো হলো না? শহিদরা আমাদের ভাষা দিয়ে গেছে। বিনিময়ে আমরা ভালো কিছু করি। তাদের জন্য দোয়াও করলাম। সেই অসহায় মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটলো এটাও তো আমাদের শহিদের সফলতা। "
দাদার ভারী ভারী কথাগুলো আমার মাথায় ঘুর পাক খাচ্ছে।
দাদা একটা কবরের সামনে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করছে। আমিও যোগ দিলাম৷ জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলো এখানে শহিদের কেউ আছেন কিনা। কিন্তু করলাম না। আচ্ছা ধরে নেই এখানে কেউ নেই। কিন্তু যারা আছে তাদের উদ্দেশ্যে দোয়া করলাম। এটাও তো ভালো কাজ। আজকে শহিদের উদ্দেশ্যে কিছু ভালো কাজ করা যায় তাই না। আচ্ছা ওই অসহায়দের হাসিগুলো ফুলের চেয়েও কেন শুভ্র লাগছিলো? কবরের মোনাজাতে বারবার আমার চোখ ভিজে যাচ্ছিলো। আচ্ছা দাদা তোমার বোকাটা কি বুদ্ধিমান হয়ে গেছে?
সেই শৈশবের দিনটার কথা আমি কখনো ভুলিনা। দাদার সাথে সেদিনও বলেছিলাম আজও বলি,"আমরা তোমাদের ভুলবো না "
লেখক- মো সিহাব








